সম্পর্কের ভিত্তি - সালমান হাবীব

"আপনার ভালোবাসা পাবার মতো

কোনো যোগ্যতাই নেই আমার"।


তাকিয়ে দেখি কখন যেন নীলা এসে দাঁড়িয়েছে পাশে। আহত পাখির মতোন বিষণ্ণ চোখ, শুকনো মুখ, আর গুমোট মেঘের দল— যেন থমকে থাকা ঝড়ের পূর্বাভাস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


নীলাকে এমন বিষণ্ণ দেখে আমি খানিক ভড়কে গেলাম। তারপর বললাম; কী হয়েছে আপনার?

খানিক আগের শোনা ঠিক একই কথাটি পুনরাবৃত্তি করলো নীলা; "আপনার ভালোবাসা পাবার মতো কোনো যোগ্যতাই নেই আমার"। আমি বললাম; কেনো? হঠাৎ এমনটি কেনো মনে হচ্ছে! নীলা বললো; জোড়া ভ্রু, ডাগর চোখ, কলকাতার দাঁত, গালে পড়া টোল, খুনি তিল এসবের কিছুই আমার নেই। অথচ আপনার তো এসব পছন্দ। 


আমি খানিক হাসলাম। মনে মনে। সেই হাসির কিছুটা আভাস ছড়িয়ে পড়লো আমার চোখেমুখে। এমন বিষণ্ণ-বার্তার পরও আমাকে হাসতে দেখে নীলা আরও মন খারাপ করলো। ধান-ভর্তি ডিঙি নাওয়ের গলুইয়ে আচমকা জল ছোঁয়ার মতো করে নীলার চোখের পাতা ছুঁয়ে গেল লুকোনো কান্নার জল। আমি নীলাকে ডাকলাম। নীলা সাড়া দিল। কিন্তু চোখের পাতা তুললো না। মাঝখানে অভিমান দাঁড় করিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো দূরে। আমি দু পায়ে দূরত্ব মাড়ালাম। কাছাকাছি গিয়ে হাতের একটা আঙুল ছুঁয়ে বললাম; এদিকে তাকান। বন্ধ চোখের পাতা মেলে তাকাতেই টুপ করে ঝরে গেল একফোঁটা জল। 


আমি হাতের স্পর্শে জলের দাগটাকে মুছে দিতে দিতে বললাম; ধরুন আমাদের দু'জনের একটা ঘর। সেই ঘরে খুব সুন্দর ডেকোরেশন, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নানান রঙের বাতি, এয়ারকন্ডিশন। সবকিছুর ব্যবস্থা আছে। এগুলোকে সচল করার জন্য শুধু ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তাহলে কি এসব ডেকোরেশন, আলোকসজ্জা, লাইটিং, এয়ারকন্ডিশন এসবের কোনো মূল্য আছে? নীলা কিছুক্ষণ আমার কপালের উপরে চুলের গোড়ার তিলটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর বললো; না, কোনো মূল্য নেই। আমি বললাম; কেনো? কেনো মূল্য নেই? নীলা বললো; কারণ ইলেক্ট্রিসিটি ছাড়া এগুলো অচল, কার্যকারিতা হীন। 

সালমান হাবীব

আমি বললাম; ধরুন আমাদের দু'জনের একটা ঘর। ডেকোরেশনহীন, ছিন্ন মলিন, একটা মাত্র লাইট, এয়ারকন্ডিশনের পরিবর্তে পুবের দিকে একটা জানলা কাটা। কিন্তু আমাদের ইলেক্ট্রিসিটি আছে। সেই ইলেক্ট্রিসিটিতে আমাদের ঘরের একমাত্র বাতিটা আলোর বানে ভাসিয়ে দেয়। ঘর ছাপিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ে উঠোনে। 


নীলা মনোযোগ দিয়ে আমার কথা শুনছে।

ছোট্ট চড়ুইয়ের মতো হাত দুটি আমার হাতের মুঠোয়। আমি বললাম; এইযে জোড়া ভ্রু, খুনি তিল, কলকাতার দাঁত, টোলপড়া গাল, ইহকাল আটকে থাকা নথ। এগুলো হলো ঘরের ডেকোরেশন, আলোকসজ্জা, লাইটিং, এয়ারকন্ডিশন। আর ভালোবাসাটা হলো ইলেক্ট্রিসিটি। এগুলো থাকার পরেও যদি ভালোবাসা না থাকে তাহলে সবকিছুই মূল্যহীন। অথচ এসবের কিছুই না থেকেও ইলেক্ট্রিসিটির মতো কেবল ভালোবাসাটা থাকলে আলোর বানের মতো ভেসে যাবে সুখ। জীবন ভরে উঠবে আশ্চর্য সুখের কোলাহলে। 


নীলা তখন শক্ত করে আমার হাত দুটো জড়িয়ে ধরলো। তারপর বললো; ভালোবাসা ব্যতীত আপনাকে দেবার মতো এক জীবনে আমার আর কিছুই নেই। আমি চুপিচুপি বলি; আমি পরিতৃপ্ত এইটুকুতেই।


Our Another blog ↓


Comments

Post a Comment

Popular posts from this blog

শূন্য - শরিফুল ইসলাম

ফাও আলাপ

ক্ষয় ~ শরীফ উদ্দীন

অঙ্ক - চিত্রদীপ বসু

অতৃপ্ত মন - সৈয়দ সানুর আহমেদ

তুই কি আমার দুঃখ হবি - আনিসুল হক

ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া।

আব্বু-আম্মুর প্রতি সন্তানের হক।

বিরিয়ানি - চিত্রদীপ বসু

To be safe from Shirk read these dua three times.