ইনকাউন্টার ~ আফরাহ্ হুমায়রা

জিসানের সাথে বিয়েটা যদিও আমার অনিচ্ছায় একরকম হুটহাট করেই হয়ে যায়।
তবুও বাধ্য হয়েছিলাম মানিয়ে নিতে।
ওপর দিয়ে যদিও মানিয়ে নিচ্ছিলাম ।
কিন্তু ভেতর থেকে জিসানকে আমার একদম সহ্য হচ্ছিল না।
ওকে দেখলেই আমার গা জ্বলে উঠেছিল।
জানি না আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল ,জিসানের সাথে আমার যায় না।
কিংবা আমার সাথে জিসানের যায় না।
দুজন মানুষ সব সময় দুই মেরুরই হয়। কিন্তু তাদেরকে মানিয়ে নিতে হয় নিজেদের মাঝে।
কথাটা আমিও জানি। কিন্তু মানতে পারছিলাম না।
এ কথাটা কিন্তু সত্যি!
মানুষ যা জানে সেটা মানতে পারে কম।
জিসান স্টুডেন্ট লাইফ থেকেই আমার বাবার ভীষন প্রিয় ছিল!
ছেলে হিসেবে জিসান কোন দিক দিয়েই কম নয়। দেখতে যেমন সুন্দর। ঠিক তেমন সুন্দর তার ব্যবহার। সবার ওকে পছন্দ ছিল ভীষণ।
কিন্তু আমারই যে কেন পছন্দ ছিল না !
এটাই জানি না।
বিয়ের প্রাথমিক দিকে আমি জিসানের সাথে এত পরিমান দুর্ব্যবহার করেছি। হয়তো কেউ নিজের বাড়ির কাজের লোকের সাথেও এমন দুর্ব্যবহার করে না।
কিন্তু জিসান ছেলেটা খুব অদ্ভুত ছিল! আমার এসব দুর্ব্যবহার কখনো গায়ে মাখতো না ।
সবসময় একটা মিষ্টি হাসি দিত ।যেন এসব কিছুই না। এসব হয়ে থাকে।
আমি আরও অবাক হতাম! যখন আমার শত দুর্ব্যবহার করা সত্ত্বেও জিসান আমার সাথে ভালো ব্যবহার করত। আমাকে প্রচন্ড রকম ভালোবাসতো !
আমার সামান্য কষ্টে কেমন উতলা হয়ে উঠতো আর বলতো,
-দেখো আয়রা তুমি আমাকে পছন্দ নাই করতে পারো। তবে আমি তোমাকে ভালোবাসি !
তুমি যতদিন না চাইবে ততদিন সবকিছু স্বাভাবিক থাকবে। আমি তোমাকে কথা দিচ্ছি!
এসব কথার আমি কখনো কোন উত্তর দিতাম না।
আমাদের দূরত্বের ভিতর দিয়ে বিয়ের দশটা মাস কেটে যায়। এর মাঝে জিসান আমার থেকে সামান্য শ্রদ্ধা, ভালোবাসা কিছুই পাইনি ।
যদিও এসব নিয়ে ও কোনদিন আফসোসে করেনি। অবশ্য আমাকে অবহেলাও করেনি।
কিন্তু বিয়ের দশ মাস পেরোনোর পরই আমি বুঝতে পারলাম আমি জিসানকে কতটা ভালোবাসি।
এবং এটাও বুঝতে পারলাম আমার স্বামী হওয়ার এক এবং একমাত্র অযোগ্য যদি কেউ থাকে সেটা শুধু জিসান।
আমার বুঝতে যদিও খুব দেরি হয়েছিল ।কিন্তু আমি যেদিন বুঝতে পেরেছিলাম ।ঠিক সেদিনই
জিসানের কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম ।
হাতজোড় করে ওর কাছে জীবনটা নতুন করে শুরু করার সুযোগ চেয়েছিলাম ।
জিসান কিন্তু আমাকে ফিরিয়ে দেয়নি।
আমাকে সুযোগ দিয়েছিল একজন আদর্শ স্ত্রী হয়ে উঠে দাঁড়াবার।
জিসান অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্ট ছিল ।কোন চাকরি ছিল না ।সে জন্য অবশ্য ওর বাবা-মা যথেষ্ট কথা শোনাতো ওকে।
তবু আমরা ভালো থাকার চেষ্টা করতাম।
এরপর বাকি দুই মাস আমাদের জীবনটা এত সুন্দর করে কেটে ছিল ।যে,আমার মনে হয়েছিল আমার জন্মের পর বিয়ের দশ মাস পর্যন্ত এত সুন্দর মুহূর্ত আমার জীবনে কখনোই আসেনি।
কিন্তু ওই,
সুখ কপালে নেই যার
দুঃখ আসে ফের তার।
সেদিন আমার প্রচন্ড শরীর খারাপ ছিল।
জিসান আমাকে কল করে হসপিটালে থাকা রিপোর্ট গুলো তুলে ডাক্তারের সাথে দেখা করতে বলে।
সে মতে আমি ডাক্তারের কাছে চলে যাই।
সন্ধ্যে আটটা নাগাদ ডাক্তার আসে। ডাক্তারের চেম্বার এ কথা বলে আমি জিসানকে কল করলাম,
-হ্যালো জিসান!
তোমার জন্য একটা গুডনিউজ আছে ।
আমি জানি তুমি খুব খুশি হবে এই নিউজ টা শুনলে।
ওপাশ থেকে কেউ একজন ঝাঁঝালো গলায় বলল,
_ম্যাডাম রাগ খুশির মামলাটা না হয় থানায় এসেই মিটিয়ে যান।
ভদ্রলোকের কথা শুনে আমার পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল‌।
এটা আবার কেমন কথা? থানায় কেন যাব?
আমি ছুটে গেলাম থানায়।
দশটা প্রায় বাজতে চলেছে।
থানায় ঢুকেই দেখি জিসান একটা চেয়ারে বসা।
শান্ত স্বভাবের জিসানের চোখেমুখে অশান্তির ছোঁয়া।
আমি দৌড়ে গিয়ে জিসানের কাঁধে হাত রেখে বললাম,
_কি হয়েছে জিসান ?পুলিশ তোমাকে এখানে আটকে কেন রেখেছে?
তুমি জানো তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।
জিসান শান্ত চোখে আমার দিকে তাকালো। তারপর
মুখে শুকনো হাসি এঁটে বলল ,
_আমি জানিনা তুমি আমাকে কি বলবে। তবে শোনার খুব ইচ্ছে। ডাক্তার কি বললেন?
আমি জিসান এর দিকে রিপোর্ট এগিয়ে দিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বললাম,
_জানো জিসান তুমি না,,,,
আমাকে থামিয়ে দিয়ে একজন পুলিশ অফিসার বলে উঠলেন,
_শুনুন ম্যাডাম এটা ড্রামা করার জায়গা নয়।
আপনি জানেন আপনার স্বামীকে এখানে কেন আনা হয়েছে?
আমি না জানার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লাম।
তারপর ওই অফিসার বললেন,
_উনার ব্যাগে ড্রাগস পাওয়া গিয়েছে।
আর উনি এই ব্যবসায় জড়িত।
আমি দুই কান চেপে ধরে চিৎকার করে বলে উঠলাম,
_মিথ্যে কথা আমি বিশ্বাস করিনা ।আমি সবার ব্যাপারে এ কথা বিশ্বাস করলেও জিসানের ব্যাপারে এই কথা বিশ্বাস করতে পারবো না।
পুলিশ অফিসার ঝাঁঝালো গলায় বলে উঠলো,
_আপনার বিশ্বাস করা লাগবে না ম্যাডাম ।
বেকার ছেলেরা এসবই করে ।সেটা আমরা জানি। পারলে কুলাঙ্গারটা কে জিজ্ঞাসা করেন এটা সে করেছে কিনা?
আমি অসহায়ের মত জিসান এর কাছে এসে দাঁড়ালাম। জিসান মাথা নিচু করে আছে।
অদ্ভুত এই ছেলেটা আজকে আমার দিকে তাকাচ্ছে ও না!
আমি দুই হাত দিয়ে আলতো করে জিসানের মুখ ধরে আমার দিকে ফিরিয়ে বললাম,
_জিসান তুমি কিছু করোনি তো?
জিসানের চোখ দিয়ে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। তারপর একটু তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল,
_সারা দুনিয়া আমাকে অবিশ্বাস করেছে। আমার বাবা-মা আমার সাথে যোগাযোগ করছে না।
তুমি আমাকে আর কি বিশ্বাস করবে ?
আমি চিৎকার করে বললেই বা আমার কথা কে শুনবে?
আমি জিসানকে জোরে ঝাঁকি দিয়ে বললাম,
_বিশ্বাস-অবিশ্বাসের মামলা পরে ।আমি জানতে চাইছি তুমি কিছু করেছ?
জিসান এবার হেঁচকি দিয়ে কেঁদে আমাকে জাপটে ধরে বললো,
আমি কিছু করিনি। বিশ্বাস করো !
আমি কিছুই করিনি।
আমি হসপিটালেই যাচ্ছিলাম তোমারই কাছে।
পথিমধ্যে হঠাৎ দুজন পুলিশ আমাকে আটকায় ।তারপর বলে যে ,এখানে নাকি একজন ড্রাগস পাচারকারী পালিয়েছে ।
তাকেই তারা তল্লাশি করছে ।আমাকে বলল ,
_আপনার ব্যাগ দেখান ।
আমি আমার ব্যাগ দিয়ে দিয়ে দিলাম ।
আমার ব্যাগে তারা কিছুই পায়নি ।
এরপর আমি চলে আসছিলাম।
কিন্তু আয়রা কিছুদুর যেতেই আরেকটা স্টপেজ এ আরো কিছু পুলিশ আমাকে আটকায় ।
আর তখন তার আমার ব্যাগে ড্রাগস পায়।
আমি নিজেও জানিনা কি করে আমার ব্যাগের ড্রাগস আসতে পারে!
জিসান আমার দুই হাত শক্ত করে ধরে কাঁদতে থাকে।
নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার ভাষা ও খুঁজে পেলাম না।
জিসানকে আর কি করে সান্তনা দিব?
আমি পুলিশ অফিসার এর কাছে গিয়ে বললাম ,
স্যার আমার স্বামীকে ফাঁসানো হয়েছে ।
সে কোনভাবেই এরকম কিছু করতে পারে না।
তখন অফিসার আমাকে বললেন,
_দেখুন আমরা আপনার কাছে টাকা চাই না।
আমাদের টাকার কোন প্রয়োজন নেই।
তবে আপনি চাইলে কিন্তু আপনার একটা রাত,,,,,,,
বিনিময় আপনার স্বামী কে আমরা ছেড়ে দিব।
অফিসারের কথা শেষ হতেই বাকিরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো।
আমি তিন পা পিছিয়ে আসলাম।
আর মনে মনে বললাম,
আমার স্বামী যদি তোদের হাতে বন্দি না থাকতো। তাহলে আজ তোদের আমি বলতাম,
স্বাধীন দেশে বাস করছি কি তোদের ভোগ্যবস্তু হওয়ার জন্য ?
তবে তো পাকিস্তানি রাজাকাররাই বহুৎ ভালো!
অন্যের দেশের নারীকে ভোগ্য বস্তু বানিয়েছে নিজের দেশের নারীকে নয়।
জিসান আমাকে পেছন থেকে ধরে বলল,
_এরা আমাদের রক্ষী নয় এরা হলো জানোয়ার।
আমার যাই হয়ে যাক তুমি এই নোংরা খেলায় নেমোনা আয়রা।
আমি জিসান এর দিকে রিপোর্ট এগিয়ে দিয়ে বললাম, --কিন্তু জিসান,,,,
আমি কিছু বলে ওঠার আগেই তিনজন পুলিশ অফিসার জিসানকে টেনে অন্য দিকে নিয়ে গেল।
আমি আমার বাবা মাকে ফোন করে দিয়েছি ।সবাই আসছেন।
তবে অতদুর থেকে আসতে বড্ড দেরি হয়ে যাবে যে।
আমি পুলিশ অফিসারের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলাম।
এই জীবনে এরকম হায়নাদের পায়ে পড়তে হবে কখনো ভাবি নি।
সারারাত আমি থানাতেই ছিলাম। আর পুলিশ অফিসার এর পা ধরে অনেক কান্নাকাটি করেছিলাম।
কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
আমার বাবা পুলিশ কে অনেক অনুনয়-বিনয় করেছিলেন কিন্তু কোন লাভ হয়নি।
পুলিশ অফিসার একটাই উত্তর দিয়ে দিয়েছিল আমাদের,
-এরকম আসামিদের এনকাউন্টার করার আদেশ আছে উপর থেকে।
তিন তালার বারান্দার দিকে নিয়ে যাওয়া হয় জিসানকে।
বৃষ্টির কারণে নিচে হাঁটুঅব্দি পানি জমে আছে।
এক এবং শেষবার জিসান আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে বলল,
_শোনো আয়রা !
যা হচ্ছে খুব অন্যায় হচ্ছে আমি জানি।
তুমি যেন আমাকে কি বলতে চাচ্ছিলে ?
কি বলেছে ডাক্তার?
কি হয়েছে তোমার?

আমি মুখ ফুটে কিছু বলার আগে পরপর তিনটে বুলেট জিসানের বুক ছিদ্র করে উধাও হয়ে গেল।
চোখের সামনে জিসান তিন তলার বারান্দা থেকে নিচে পড়ে হাঁটু অব্দি পানিতে ডুবে গেল।
রক্তের তিন-চারটে ফুটো ছিটে এসে আমার হাতে গুঁজে থাকা রিপোর্ট গুলোর উপর লেপ্টে গেল।
সবাই আমাকে ধরে নিচে নামাতে লাগল।
আমার কেমন যেন হালকা লাগছে।
কান্নাও আসছেনা হাসিও আসছেনা।
আমি হাঁটতে লাগলাম।
নিচে নেমে একবার জিসানের মলিন মুখের দিকে তাকালাম।
জিসানকে আজকে অদ্ভুত সুন্দর লাগছে!
ইস জিসান বাবা হচ্ছে শুনার পর ওর মুখটা কি আর এমন মলিন থাকতো !!!!!
বাস্তব অবলম্বনে।

Comments

Popular posts from this blog

শূন্য - শরিফুল ইসলাম

ফাও আলাপ

ক্ষয় ~ শরীফ উদ্দীন

অঙ্ক - চিত্রদীপ বসু

অতৃপ্ত মন - সৈয়দ সানুর আহমেদ

তুই কি আমার দুঃখ হবি - আনিসুল হক

ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া।

আব্বু-আম্মুর প্রতি সন্তানের হক।

বিরিয়ানি - চিত্রদীপ বসু

To be safe from Shirk read these dua three times.