অসমাপ্ত ~ মোঃ ইয়াসিন

কলমের এক খোঁচায় দীর্ঘ সাতচল্লিশ বছরের দাম্পত্ত জীবনের ইতি টেনে উঠে দাঁড়ালাম। আদিবার দিকে তাকাতেই সে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। চশমা ছাড়া সবকিছু আবছা দেখালেও আদিবার ছল ছল করা চোখ আমি স্পষ্ট দেখতে পেয়েছি। ইচ্ছে করছে তার মাথায় হাত বুলিয়ে সান্তনা দেই। কিন্তু এ যে আর হবার নয়। ডিভোর্স পেপারে সাইন করার পর আমি যে পর হয়ে গেছি। রাতুল মায়ের হাত ধরে বেরিয়ে গেছে। ফিরে তাকায়নি যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্যে পা রাখা বাবার দিকে। অথচ দাঁড়ি পাকা বৃদ্ধ এক অভাগা পিতা অধীর আগ্রহে চেয়ে আছেন সেদিকে কারোর খেয়াল নেই! ওরা চলে গেছে। দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে ফিরে তাকালাম। টেবিলের উপরে পরে থাকা চশমাটা হাতে নিয়ে পাঞ্জাবির কোনাখানা দিয়ে গ্লাস পরিষ্কার করে মুচকি হাঁসি দিলাম। যাক! সবকিছু ছেড়ে গেলেও চশমাটা আমায় ছাড়তে পারেনি।
বাইরে বেরিয়েছি সবে, বৃষ্টি চলে এসেছে। বৃষ্টির টপাটপ ফোঁটা সরাসরি টাকমাথায় এসে পড়লে ব্যাথা পাওয়া যায়, আর সেই ব্যাথায় কাতর করতেই হয়তো রৌদ্র ফুড় করে ছুটে এসেছে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি।
দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে বসলাম। পুরনো স্মৃতি ধাওয়া করেছে আমায়।
সেদিনও বৃষ্টি ছিলো। ছিলাম আমি। বয়স তখন চব্বিশ থেকে পঁশিচে পা রেখেছি। বন্ধু-বান্ধবের সাথে আড্ডা দিয়ে গভীর রাত করে বাসায় ফিরাটা পেয়ে বসেছিলো আমায়। সেদিনও আড্ডা দিতে দিতে রাত হয়ে গেছে। পকেট থেকে ফোন বের করতেই চোখে পড়ল ২৭মিসড কল! ফোনকলগুলি বাবার নাম্বার থেকে। রাত ১১.৪২মিনিট। বন্ধুদের থেকে বিদায় নিয়ে একটা চুইংগাম মুখে পুরলাম, যাতে নিকোটিনের গন্ধটা মুখে না থাকে।
দৃঢ় পায়ে এগিয়ে চলেছি। একটা রিক্সা পেলে মন্দ হতোনা। তবে এই অবেলায় রিক্সা নিয়ে আসবে কে?
চারিদিকে ধুকধুকে অন্ধকার। রাস্তার দু'পাশে ল্যাম্প পোস্ট থাকলেও অধিকাংশ বাল্ব নষ্ট। এতো এতো ল্যাম্প পোস্টের মধ্যে মাত্র একটা ল্যাম্প পোস্টে আলো জ্বলছে। ল্যাম্প পোস্টের নিচে কেউ একজন বসে আছে সম্ভবত! এই আবছা আলোয় সবকিছু ঠিকঠাক দেখা যায়না। এগিয়ে গেলাম।
একটা মেয়ে গুটিগুটি হয়ে বসে আছে। আমাকে দেখতে পেয়ে কাঁপতে শুরু করেছে। অভয় দিয়ে কিছু একটা বলতে যাবো ঠিক তখনই মাথায় আসে, মেয়েটার কাপড় ভেজা। এজন্যই হয়তো কাঁপছে।
গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে বললাম, কি হে? এত রাতে ভেজা জামা গায়ে রাস্তায় বসে আছ যে বড়!
আমার কথা শুনে মেয়েটি মাথা উচু করে তাকালো।
কি অপরূপ তার চাহনি। গায়ের রং শ্যামলা হলেও ল্যাম্প পোস্টের আবছা আলোয় বাদামী রঙ ধারণ করেছে। গালদু'টো গুলাকৃতির, অনেকটা কমলালেবুর ন্যায়। হাঁসলে গালে টোল পড়বে হয়তো। আর তার চোখ, যেন স্বচ্ছ পানিতে চাঁদনী রাতের আলো পরেছে।
বেচারি অনেকটা কাঁদো কাঁদো কন্ঠে বলল, অর্নব দশটায় আসার কথা, অথচ এখনও আসেনি। তার ফোনও বন্ধ!
মেয়েটার কথা শুনে আর তার হাতে থাকা ব্যাগ দেখে বুঝা হয়ে গেছে, বেচারি ধোকা খেয়েছে।
আমি খানিকটা সময় চিন্তা করার ভান করে নখ কামড়ে দু'একটা নখ ছিঁড়েছি। তারপর গুরুগম্ভীর ভাব নিয়ে বললাম, আচ্ছা আপনার নামটা যেন কি?
সে গোমড়া মুখে উত্তর দিল, আদিবা
মুখে বৈজ্ঞানিক ভাব নিয়ে বললাম, শুনো আদিবা। অর্নব তোমাকে ধোকা দিয়েছে। সে আর আসবেনা।
সে অনেকটা আশ্চর্য হয়ে বলল, এখন আমি কি করবো?
আমি বললাম যেভাবে চুপিচুপি বাসা থেকে পালিয়ে এসেছেন ঠিক তেমনিভাবে চুপিচুপি ঘরে ফিরে যান।
সে খানিকটা চমকে উঠে বলল, আমি চুপিচুপি পালিয়ে এসেছি, তা আপনি জানলেন কিভাবে?
মাথা ঠান্ডা রেখে নিচু স্বরে বললাম, চিৎকার চেচামেচি
করে কেউ ঘর থেকে পালায়?
আদিবা বলল, আচ্ছা চলেন।
আদিবা আগে আগে হাঁটছে আর আমি তার পিছু পিছু। আবহাওয়া ও সম্ভবত সায় দিচ্ছে। উত্তর দিক থেকে হাওয়া প্রবল বেগে ছুটে এসেছে। থমথমে পরিবেশ বিরাজমান। বৃষ্টির পানি ছেয়ে গেছে পুরোটা রাস্তা।
আদিবা বিশাল এক বাড়ির ভিতর প্রবেশ করল। ভিতরে গিয়ে গেট বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ কেউ একজন অধির আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে "ধন্যবাদ" শব্দটা শুনার জন্য!
গেটের সামরে দাঁড়িয়ে আছি অনেক্ষণ, কোনো রকমের সাড়া শব্দ নেই। চারিদিকে সুনশান নিরবতা। আদিবা হয়তো এতক্ষণে ঘুমিয়ে পরেছে। যাইহোক, আজ বহুদিন পর একটা পূর্ণের কাজ করতে পেরেছি এটাই অনেক। দ্রুত পায়ে বাসার দিকে রওনা দিলাম। চারিদিকের বাড়িগুলোতে আলো নিভে গেলেও আমাদের বাড়ির আলো এখনও নিভেনি। সাবধানতার সহিত গেট খুলেছি তবুও প্রচন্ড শব্দ হয়েছে। লোহার গেটে জং ধরেছে যেকারণে খুলতে গেলে খিচখিচ শব্দ হয়। গেটের শব্দ শুনে মায়ের বুঝা হয়ে গেছে আমি ফিরেছি। কলিংবেল বাঁজানোর আগেই দরজা খুলে দিলেন তিনি। খাবার টেবিলে খাবার সামনে রেখে বাবা বসে আছেন। আমাকে বললেন, তুই হাত-মুখ ধুয়ে আয়। ভেবেছিলাম বাবার বকা শুনতে হবে কিন্তু না বকা দেননি তিনি। মাঝে মাঝে বাবা-মা'র আচরণ আমাকে ভাবায়। আমার চিন্তাশক্তিকে হার মানিয়ে পরাজিত করেন তারা। তাদের বন্ধুসুলভ আচরণ মুগ্ধ করে আমায়।
খাবার টেবিলে বসেছি তবে খাওয়া হচ্ছেনা। আদিবার সহজ-সরল মুখটা বারবার ভেসে উঠছে চোখের সামনে! নিরবতার অবসান ঘটিয়ে বাবা বললেন, কে সে?
আমি খানিকটা ইতস্তত হয়ে বললাম, কার কথা বলছো?
বাবা মুচকি হেঁসে বললেন, যার কথা ভাবছিস।
তারপর আমি একাধারে পুরো কাহিনি খুলে বলি, যেন সদ্য মুখস্ত করা রচনা!
পুরো ঘটনা শুনার পর বাবা মুখ গোমরা করে শুবার ঘরে চলে গেলেন! ইচ্ছে করছিলো ডেকে জিজ্ঞেস করি, বাবা কিছু বল্লেনা যে? কিন্তু না কিছুই জিজ্ঞেস করিনি। আমিও নিজ কক্ষে গিয়ে শুয়ে পরি।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙে বাবার গোলগাল মুকখানা দেখে। নতুন পাঞ্জাবি পড়েছেন তিনি! শরির থেকে পারফিউমের গন্ধ বেরুচ্ছে! আমার টেবিল থেকে নিজের শরিরে মেরেছেন হয়তো। আমি চমকে উঠলাম। বললাম, কোথাউ যাচ্ছো বাবা?
বাবা গম্ভীর কন্ঠে বললেন, শুধু আমরা না তুইও যাচ্ছিস!
মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে বললাম, কিন্তু কোথায়?
বাবা কিছু বলেননি। আমাকে টেনেটুনে নিয়ে গেছেন গোছলখানায়। তারপর নিজ হাতে গোছল করিয়ে দিয়েছেন।
গোছল সেরে বেরিয়েছি সবে। মা বাইরে দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে নতুন শাড়ি! নাক, কান, গলায় স্বর্ণের হাড়গুলো ঝুলিয়ে দিয়েছেন!
খানিকটা ইতস্তত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, এত সাজগোজ কেন মা?
মা কিছু বলেননি। ঠোঁটের কোনে ভেসেছে মুচকি হাঁসি। তারপর গাড়িতে উঠে বসলেন। সেই পুরনো গাড়ি, সেই পুরনো ড্রাইভার।
মজিদ ভাই অর্থাৎ ড্রাইভার সাহেব বারংবার ফিরে ফিরে আমার দিকে তাকাচ্ছেন আর মুচকি মুচকি হাঁসছেন! বিষয়টা বিরক্তিকর হলেও চুপ করে বসে ছিলাম।
হঠাৎ বাবা গাড়ি থামাতে বললেন। গাড়ি থামলো। তিনি নেমে পরেছেন অথচ আমাদের নামতে দিচ্ছেন না! আমাদের গাড়িতে বসিয়ে রেখে তিনি কোথায় যেন মিলিয়ে গেছেন।
রৌদ্রের প্রচন্ড উত্তাপ গাড়ির গ্লাস ভেদ করে গায়ে এসে পরেছে। বিরক্ত হয়ে গাড়ি থেকে নামতে যাবো ঠিক তখনই বাবার আগমন।
এক হাতে মিষ্টির প্যাকেট আর এক হাতে ফলমুল নিয়ে এগিয়ে আসছেন। আমি গাড়িতেই বসে রইলাম। বাবা গাড়িতে উঠতেই আবার চলতে শুরু করলো। বেলা বেশি হয়নি। চারপাশের দোকানপাট খুলতে শুরু করেছে সবে। আনুমানিক দশটা কি সাঁড়ে দশটা বাঁজে। আমরা গাড়ি থেকে নামলাম।
মাটিতে পা রেখে নতুন করে চমকে উঠলাম। আদিবার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি!
মা-বাবা চলতে শুরু করেছেন আর আমি দাঁড়িয়ে আছি নিস্তব্ধ পাথরের ন্যায়। বাবা পিছনে ফিরে এসে আমার হাত ধরে টেনে ভিতরে নিয়ে গেলেন। কলিংবেল বাঁজাতেই মায়ের বয়সি একজন মহিলা দরজা খুলে আমাদের সাদরে গ্রহণ করলেন। ইনি হয়তো আদিবার মা।
বাবার বয়সি একজন সোফায় বসেছিলেন। আমাদের দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন। আমরা বসলাম। তারপর নতুন বধুর বেশে আগমন ঘটলো আদিবার।
এতক্ষণে অল্প অল্প করে বুঝতে পেরেছি। বাবা হয়তো রাতেই আদিবার বাবার সাথে কথা বলেছেন। পরক্ষণে জানতে পারি আদিবার বাবা আব্বুর ছোটবেলার বন্ধু।
সময়ের পালাক্রমে আমাদের বিয়েটা হয়ে যায় স্বাভাবিকভাবেই।
বিয়ের তিন বছরের মাথায় আমাদের একটা ছেলে সন্তান পৃথিবীতে আসে। বাবা নাম দেন রাতুল।
তারপর দেখতে দেখতে কেটে গেছে বহুবছর। কাপড়ের পুটলির ভিতর থেকে চেয়ে থাকা ছেলেটা আজ বড় হয়েছে। গত ক'দিনে যেমন পেয়েছি তেমন হারিয়েছিও। বাবা ইতি হয়েছেন দু'বছর। বাবার শোকে কাতর আমার মা গত ছ'মাস আগে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেছেন।
তারপর থেকে জীবনটা কেমন যেন সাদামাটা হয়ে গেছে। সবকিছু কেমন যেন বিষাদময়!
পাল্টে গেছে পৃথিবীর স্বাদ। বৃষ্টির টপাটপ শব্দ এখন আর মন কাড়ে না। উথাল পাথাল দমকা হাওয়া প্রাণে দোলা দেয়না এখন। মায়ের হাতে রান্না করা খিচুরির মত খিচুুরি কেউ রাঁধতে পারে না। আর চোখ! চোখ দুটো বিশ্রাম চায় সারাক্ষণ। চশমা ছাড়া কোনো কিছুই স্পষ্ট দেখায় না।
লোকমুখে শুনেছি, আমি নাকি আধ-পাগলা!
পাগলদের বোধশক্তি থাকে নাকি?
না না। আমি পাগল হতে যাব কেন?
সমাপ্ত

Comments

Popular posts from this blog

শূন্য - শরিফুল ইসলাম

ফাও আলাপ

ক্ষয় ~ শরীফ উদ্দীন

অঙ্ক - চিত্রদীপ বসু

অতৃপ্ত মন - সৈয়দ সানুর আহমেদ

তুই কি আমার দুঃখ হবি - আনিসুল হক

ক্ষমা প্রার্থনার দোয়া।

আব্বু-আম্মুর প্রতি সন্তানের হক।

বিরিয়ানি - চিত্রদীপ বসু

To be safe from Shirk read these dua three times.